11:43 AM বিশ্বকাপের মূলপর্বে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ আর্জেন্টিনার  |  ইতালির মিলানে বক্সিং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনালে জিতে পদক নিশ্চিত করলেন বিজেন্দ্র সিংহ  |  অবসর ভেঙে বাংলার হয়ে রঞ্জি খেলার ইচ্ছে প্রকাশ সৌরভের, ফিরতে চান ৪ দিনের ম্যাচে, স্বাগত জানালেন নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়  |  বৈদিক ভিলেজের টাকায় দুবছরেই কোটিপতি গফফর, জেরায় প্রকাশ চাঞ্চল্যকর তথ্য  |  প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও শুল্ক দফতরের ছাড়পত্র পেয়ে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে উড়ল সংযুক্ত আরবআমিরশাহির অস্ত্রবাহী বিমান  |  সিঙ্গুরের জমি কিনতে রাজি রেল, ৪০০ একর কৃষকদের ফিরিয়ে দিয়ে বাকি অংশ হবে কোচ কারখানা, স্টার আনন্দে জানালেন মমতা   |  জোর করে জমি কেড়ে নেয়া নয়, রেলেরও উচিত জমি কিনে প্রকল্প গড়া, জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  |  মহালয়ার দিনই দুরন্ত এক্সপ্রেসের উদ্বোধন, সেবক-গ্যাংটক রেল প্রকল্পে অনুমোদন হাজার কোটিরও বেশি  |  
 
 
 পুরনো
    9/24/2008


Suman De
মোম রোষের এক বছর


 

অবহেলায় পড়ে থাকা অসংখ্য অসমতল নুড়ি পাথর৷ কোনওটার গায়ে কোনও নাম লেখা নেই৷
পাথরকুচির শাসন এড়িয়ে মাথা তুলেছে কত সবুজ ঘাসের চারা৷ কোনওটার গায়ে রক্তের বাসি দাগ—না তা-ও লেগে নেই৷ পাতিপুকুর শান্তি কলোনির পাশে ৩ নম্বর লাইন ধরে অসংখ্য ট্রেন ছোটে, প্রতিদিন৷ সে দিনের সেই ঘাতক ট্রেনটির মতো ১৫ মিনিট লেট আজও হয় কত ট্রেন৷ কত অস্বাভাবিক মৃত্যু, কত ট্রেনে কাটা পড়ার ঘটনাই তো ঘটছে রোজ, তা সত্ত্বেও একটা শব্দ বিদ্যুতের ঝিলিক এনে দিল শান্তি কলোনির বছর তিরিশের শম্ভু মল্লিকের চোখে৷ “ওই তো, ওইখানে পড়ে ছিল বডিটা, আড়াআড়ি ভাবে,” আঙুল তুলে দেখালেন শম্ভু৷ সত্যিই প্রত্যক্ষদর্শী? যাচাই করার উপায় নেই৷ তবে শব্দটা দু’বারও বলতে হয়নি৷

আজও এতটাই জীবন্ত শব্দটা, নামটা৷
রিজওয়ানুর৷

Riza.JPG
সময়ের হিসেবে এক বছর৷ ঠিক গত বছর পুজোর আগে বাঙালি বুঝেছিল, কত শক্তিশালী হতে পারে অহিংস নাগরিক প্রতিবাদ৷ রাজনীতির ঘোলাজল বাঁচিয়েও কী ভাবে ছিটকে দেওয়া যায় উদ্ধত সিংহাসন৷ মধ্যপ্রাচ্যে লায়লা-মজুন ছিল, পঞ্জাবে হীর-রাঞ্জা বা সোনি-মাহিওয়াল তো ছিলই, বাঙালি প্রায় সেই উচ্চতাতেই বসিয়ে ফেলেছিল রিজওয়ানুর-প্রিয়ঙ্কার প্রেমকাহিনি৷ টিভির পর্দায় প্রিয়ঙ্কার টেলিফোনিক সাক্ষাত্কারের পর অবশ্য সেই মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল৷ প্রিয়ঙ্কা এখন মিডিয়া পাপারাতজির নজর থেকে নিরাপদ দূরত্বে৷ কয়েক মাস আগের শেষ ফুটেজে প্রিয়ঙ্কা পুজোর ফুল হাতে তারাপীঠে৷ জিনস-টিশার্ট পরা আর পাঁচটা তরুণীর মতোই চঞ্চল৷ ঝড়ঝাপ্টার রেশ ফিকে হতে শুরু করেছে৷ গত ছ’মাসে বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারত—ঘুরেছেন বেশ কয়েকটি তীর্থস্থান৷ মাঝেমধ্যে তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে মাল্টিপ্লেক্সে, হ্যাঁ, তা-ও আছে৷
কিন্তু সেই প্রাসাদোপম অট্টালিকা? সল্টলেকের সিজি ব্লকের সেই ২৩৫ নম্বর বাড়িটা? রিজওয়ানুর কাণ্ডে যখন রাজ্য উত্তাল, যখন ওই বাড়িটার সামনে গোটা দেশের সবকটি টিভি চ্যানেলের ওবি ভ্যান, একেবারে টোয়েন্টি ফোর ইন্টু সেভেন ডিউটি দিচ্ছে, তখন বিধাননগর পুরসভা যে জানিয়েছিল, ওই বাড়ির তিন তলার আইনি বৈধতা নেই৷ উপরন্তু, নগরোন্নয়ন দফতরের খাতায় ওই বাড়ির মালিক নাকি অশোক বা প্রদীপ তোদি নন, জনৈক পি সি রায়চৌধুরী, যিনি ১৯৭৭ সালে সল্টলেকে জমির জন্য আবেদন করে জমি পান৷ অর্থাত্ জমি বা বাড়ির অবৈধ হস্তান্তর৷ যাঁরা এর ‘শেষ দেখে ছাড়ব’ বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন, এক বছর আগের সেই পুরকর্তারা আজও মসনদে৷ কিন্তু ও বাড়ির একটি ইঁটও নড়েনি৷ শুধু বাড়ির সামনে থেকে সরে গিয়েছে রিপোর্টারদের জটলা, ওবি ভ্যানের সারি৷
তবে এই এক বছরে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি এক বারও সরেনি হাইকোর্টের উপর থেকে৷ অবশেষে ১৪ অগস্ট বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পুলিশ যে ভাবে এই মামলা চালিয়েছে তা ‘অসাংবিধানিক’৷ এমনকী সিআইডি তদন্তও আইনানুগ নয়৷ অশোক তোদি, প্রদীপ তোদি, অনিল সারোগী, পাপ্পু, অজয় কুমার, সুকান্তি চক্রবর্তী, কৃষ্ণেন্দু দাসের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সিবিআই-কে নিম্ন আদালতে মামলা করার দৃষ্টান্তমূলক নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারপতি৷ পাশাপাশি, প্রসূন মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানবন্ত সিংহ, পুলক দত্ত ও জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের যে সুপারিশ সিবিআই করেছে, হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়, তা আদতে রাজ্য সরকারের এক্তিয়াভূক্ত৷ উচ্চ আদালতে পাল্টা আবেদন, তার শুনানি, মামলায় রাজ্য সরকারের নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন—এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে, এ ক্ষেত্রেও চলছে৷ কিন্তু এ পর্যন্ত বিচারপতি দত্তের রায় থেকে যা পাওয়া গেল, ন্যায় বিচারের নিরিখে তা-ই বা কম কী? রিজওয়ানুরের পরিবারের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত তাই মনে করছেন৷
কিন্তু যাঁদের জন্য এই ইনসাফের দাবি? ৭ বি, তিলজলা লেনের বাসিন্দা সেই লোলচর্ম বৃদ্ধা? সেই কিসওয়ার জাহান, যিনি জীর্ণ, রং চটে ফিকে হয়ে যাওয়া নীল লেটারবক্স বহু বছরের পুরনো অভ্যাস মতো রোজ বিকেলে খুলে দেখতে যান, তাঁর প্রিয় কাক্কুর নামে কোনও চিঠি এল কি না, এখনও! এরিনা মাল্টিমিডিয়ার আই ডি কার্ডের ছোট্ট রঙিন ছবিটা আজও প্রতিদিন সযত্নে হাতের চেটো দিয়ে মুছে দেরাজে সাজিয়ে রাখেন, চোখের জল চেপে৷ ২১ সেপ্টেম্বরের অপেক্ষা তাঁর অবশ্য নেই৷ ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রামজান মাসের ৮ তারিখেই রিজের মৃত্যুবার্ষিকী পেরিয়ে গিয়েছে৷ গোরস্থানে দোয়া, বাড়িতে কোরান পাঠ, সবই হয়েছে সে দিন৷ কিন্তু তাতে কী? রিজের বোন মিনা আজও দাদার প্রিয় বই, চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ সযত্নে তাকের সামনের দিকে গুছিয়ে রাখেন৷ তিন বছরের ভাইঝি জারা আজও রিজের ছবির সামনে দু’হাত বাড়িয়ে ‘কাক্কা’ বলে ডেকে ওঠে৷ আর রুকবানুর? ইতিমধ্যেই গত এক বছরে এ রাজ্যের সব চেয়ে পরিচিত মুখগুলির অন্যতম৷ মহল্লায় রিজের দাদার জনপ্রিয়তা এই মুহূর্তে এতটাই যে, যে কোনও দিন ভোটে দাঁড়ানোর টিকিটও পেয়ে যেতে পারেন অনায়াসে৷ সেই রুকবানুরও বলছেন, ভাইয়ের শূণ্যতা ও-বাড়িতে যেন কিছুতেই মুছে যাওয়ার নয়৷ রিজের পাড়ায় তাঁর স্মরণে শহিদবেদি হচ্ছে বটে, কিন্তু তিলজলা লেনের অকালে প্রাণ হারানো তরুণটির জীবন আমাদের আরও বৃহত্তর কিছুর শিক্ষা দিয়েছে৷

rizb.JPG
কেমন শিক্ষা? রিজওয়ানুরের ঘটনার পর মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের সংগঠন এপিডিআর-এর কাছে গত এক বছরে ছ’জোড়া দম্পতি এসেছেন পুলিশের বিরুদ্ধে বিয়েতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে৷ সুজাতবাবু বলেছেন, ছ’টি ক্ষেত্রেই রিজওয়ানুরের ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়া মাত্রই ম্যাজিকের মতো কাজ হয়েছে৷ পুলিশ তত্ক্ষণাত্ যে শুধু নবদম্পতির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা নয়, তাঁদের সাধ্যমতো নিরাপত্তা দেওয়ারও চেষ্টা করেছে৷
কিন্তু আসল বার্তাটা আরও গভীরে৷ রিজওয়ানুর রহমান নামে ওই হতভাগ্য যুবক যেন মরিয়া প্রমাণ করিল যে, আমরাও পারি৷ রাজনীতির ঝাণ্ডা ছাড়া, ধর্মীয় পতাকা ছাড়া, কোনও স্বার্থ ছাড়া আজও মানুষ একে অন্যের জন্য রাস্তায় নামতে পারে, আওয়াজ তুলতে পারে৷ রিজওয়ানুরের চিনিয়ে দেওয়া এই শক্তিকে ‘সুশীল সমাজ’ বলে কটাক্ষ করা যায়, ‘নাগরিক সমাজ’ বলে গুরুত্ব দেওয়া যায়, কিন্তু যে নামেই ডাকা হোক, ২৯ বছরের ওই ছেলেটির জন্যই আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ছেড়ে অন্তত এক বার আমরা বেরোতে পেরেছিলাম৷ মোমবাতির আলো সেই জ্বলে উঠেছিল৷ ধর্না, বিক্ষোভের রাস্তার রাজনীতি ছেড়ে প্রতিবাদের নয়া পন্থা সেই তো নতুন করে চিনেছিলাম আমরা৷ আজ গোর্খাল্যান্ডের জেহাদ হোক বা সিঙ্গুরে শিল্পের দাবি-প্রকরণ সেই মোমের নরম আলো৷ সেন্ট জেভিয়ার্সের ফুটপাথের সেই নীরব ভাষা শিখে নিয়েছে বাঙালি মনন৷ শেখাল তো তিলজলার সেই তরুণের মৃত্যুই৷
রিজ আমাদের প্রতিদিনের অংশ হয়ে গিয়েছেন৷         



 মন্তব্য


 মন্তব্য পাঠিয়ে দিন
নাম  
ই-মেল    
এখানে লিখুন    
 
  বাংলায় সংখ্যা লেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন
   
            ফিরে যান       
 
 
© 2007 STAR Group Limited. সর্ব সত্ব সংরক্ষিত অভিযোগ জানান | গ্রুপ প্রোফাইল | অনুষ্ঠানের বিবরণ | কেরিয়ার | আনন্দে বিজ্ঞাপন | আমাদের সম্পর্কে