টরোন্টোর রাস্তায় মিস ইউ.এস.এ ইন্ডিয়ার মুকুট পরে রিচা বাঙালি ছেলেদের সম্পর্কে যা বলল সেটাই হয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি যুবতীদের এক্কেবারে মনের কথা৷ ইদানিং কালের মধ্যে বিশ্বায়ন আর বাঙালি সম্পর্কে এমন সহজ সরল অথচ দারুন তাত্পর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ বোধ হয় কেউ খুব একটা আর করেনি৷ জুলাই মাসের ৪ থেকে ৬ তারিখ কানাডার টরোন্টোতে ছিল উত্তর আমেরিকা বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন৷ টরোন্টো মেট্রো কনভেনশন সেন্টারে কয়েক হাজার বাঙালি মাতিয়ে দিয়ে গেল গোটা টরোন্টো শহর৷ টরোন্টোয় এখন গরমকাল৷ উষ্ণতার পারা যতই চড়ছে, ততই পাল্লা দিয়ে কমছে টরোন্টো ললনাদের পোশাকের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ৷ এমন দুঃসাহসিক সময়কে রীতিমত অগ্রাহ্য করে টরোন্টোর তাবত্ বাঙালি সুন্দরী মগ্ন বাঙালি শাড়িতে৷ আর হবে নাই বা কেন?

টরোন্টো শহরে বাঙালি ক্লাব, কালী বাড়ি থাকলেও এত বাঙালীকে একসঙ্গে এমনভাবে তো দেখা যায় না৷
সত্যি, দেখে মনে হচ্ছিল বিমান যোগে রবীন্দ্র সদন, নন্দন, কফি হাউসটা যেন তুল এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ঝাঁ চকচকে টরোন্টো মেট্রো কনভেনশন সেন্টারের দোতলায়৷ বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন মানেই বিদেশে বাঙালির বছরকার আনন্দ উত্সব৷ তাই সংস্কৃতি, আড্ডা, নাচ-গান, নস্টালজিয়ার দেদার আয়োজন৷ বাংলা খবরের কাগজ থেকে কলকাতার শিল্পীদের অনুষ্ঠান-- ব্যবস্থা ছিল সব কিছুর৷ যার জন্য প্রতি বছরের মতো এবছরও বিদেশ বিভুঁয়ে বয়স্করা হারিয়ে যাচ্ছিলেন অমলিন নস্টালজিয়ার জগতে৷ আর তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে আকর্ষণ ছিল স্পিড ডেটিং-এর৷
এদেশে বা বিদেশে ডেটিং আর এখন কোনও নতুন ব্যাপার নয়৷ কিন্তু ‘স্পিড ডেটিং’ নিয়ে ওদেশের তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ-অনাগ্রহ, তর্ক-বিতর্ক ভাবার বিষয়৷
মিস ইউএসএ-ইন্ডিয়া ২০০৭ রিচা তো সাফ বলেই দিল- কলকাতার বাঙালি ছেলেরা হাবে-ভাবে একটু বেশি মাত্রায় পাশ্চাত্য৷ আর প্রবাসী বাঙালি ছেলেরা বাঙালি মেয়েদের দেখলে বেশি মাত্রায় ‘দেশীয়’৷ রিচার অভিযোগ, দুই জায়গাতেই বাঙালি ছেলেরা বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে৷ অতীতে রিচাও দু’একবার এই বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে স্পিড ডেটিং-এ অংশ নিয়ে ছিল৷ রিচাই মিষ্টি হাসি হেসে বুঝিয়ে দিল স্পিড ডেটিং-এর রোম্যান্স-রহস্য-রসায়ন?
উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকে আগত তরুণ তরুণীরা স্পিড ডেটিং-এর মাধ্যমে চিনে নেয় একে অপরকে৷ আধো বাংলায় অথবা চোস্ত মার্কিন ইংরেজিতে দু’মিনিটের বাক্যালাপে একে অপরকে পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে৷ তারপর রহস্যভরা বাক্যবাণে একে অপরের রসায়ন বুঝলে তবেই জমাট বাঁধবে রোম্যান্স৷ টিন এজার্সদের বয়সের ব্যবধানে আলাদা আলাদা গ্রুপও করা হয়৷ নামী মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রী মোহনা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ হিউস্টনের ডাক সাইটে সুন্দরী মোহনার কিন্তু এ হেন স্পিড ডেটিং না-পসন্দ৷
মোহনার মতে এমন স্পিড ডেটিং-এ গভীরতার বড় অভাব৷ ওঁর মতে নরনারীর সম্পর্ক তৈরী হয় গভীরতা থেকেই৷ মনের অতলান্তে তিল তিল করে গড়ে ওঠা পরিপূর্ণতাই যদি অগোচরে থেকে যায় তবে সেই পরিচয় তো তাত্পর্যহীন৷ রোম্যান্সের রহস্য তো দূর অস্ত, পরিচয়ই তো সেখানে সম্পূর্ণ নয়৷ রিচার মতে স্পিড ডেটিং-এর ভালো দিক একটাই৷ ওর ভাষায় আইস ব্রেকিং৷ একটা ঘরের বাইরে সারি দিয়ে ‘আলাপ’-এর অপেক্ষায় সবাই ৷ ঘরের ভেতরে টেবিলে টেবিলে কিছু মুহূর্ত মুখোমুখি৷ সেখানেই আলাপ, সেখানেই পরিচয় ৷ অচেনার কঠিন বরফ গলে ধীরে ধীরে৷ সহজ হয় বন্ধুত্ব৷ মাইন্ড সেট চেঞ্জ হলে.... বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত এগোতে পারে এই সম্পর্ক৷
বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে তরুণ তুর্কি শাশ্বত চক্রবর্তী৷ জন্ম মার্কিন মুলুকে৷ মুখে সবসময় কথার খই ফুটছে৷ ওঁর মতে বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আসেন এই স্পিড ডেটিং-এর কল্যাণে৷ সারা বছর সবারই সবার নাছোড়বান্দা ব্যস্ততা৷ স্বাভাবিকক ভাবেই বাত্সরিক এই অভিজ্ঞতা একটা অন্য মাত্রা এনে দেয়৷
টেক্সাসের প্রিয়ঙ্কা চক্রবর্তীর কোনও কাউবয়তেও আপত্তি নেই৷ তবে বাঙালি বন্ধু পেতে সে যে ভীষণ আগ্রহী, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷
সদ্য টিন পেরনো রাজ আর পিয়াসার পরিচয় হল এবারের স্পিড ডেটিং-এ৷ দিন পেরতে না পেরতেই ঘন হল পরিচয় ৷ দু’জনেই মগ্ন হল দু’জনায়, চোখের সামনে৷
হিউস্টন থেকে অনেক আশা নিয়ে এসেছিলেন মুনমুন চক্রবর্তী আর তার ছেলে ইন্দ্রনীল৷ মনস্তত্ত্বের মেধাবী ছাত্র ইন্দ্রনীলের ইচ্ছে, মায়ের মত তার হবু স্ত্রী যেন বাংলা বইয়ের ভক্ত হয়৷ ছোটবেলা থেকে সে দেখে এসেছে মাকে, যার মুখ প্রায়শই ঢেকে যায় হরেক রকম বাংলা বইয়ে৷ কৈশোর থেকে ইন্দ্রনীলের মাথায় একটাই চিত্রকল্প৷ বাংলা বই হাতে বাঙালী নারী৷ ইন্দ্রনীলের দুঃখ একটাই, এবার সে খুঁজে পেল না তেমন কাউকে৷ মা মুনমুন লাজুক ইন্দ্রনীলকে সাত্ত্বনা দিলেন, সবুরে মেওয়া ফলে৷ অবশ্য মার্কিন ইংরাজিতে ব্যাখ্যা টীকা সহ৷
বিশ্ব বিখ্যাত এক সংস্থার ডিরেক্টর অব এডুকেশন পলা গঙ্গোপাধ্যায়৷ সম্পর্কে রিচার মা৷ তিনি মনে করেন স্পিড ডেটিং উত্তর আমেরিকার বাঙালি বাবা-মায়েদের উত্সাহ কম নয়৷ এসবই বাংলার টানে...৷ প্রাচুর্যের শিখরেও শিকড় যে বড় টানে...৷

কে জানে..., ইন্দ্রনীল হয়ত কখনও খুঁজে পাবে তার স্বপ্নের নায়িকাকে৷ টেক্সাসের শাশ্বত (যে নিজেকে আবার ওল্ড ফ্যাশন’ড মনে করে) খুঁজে পাবে ঠিক তাঁরই মত একজনকে৷ এমনকি স্পিড ডেটিং না-পসন্দ মোহনাও হয়ত হঠাত্-ই ....... ৷ এমন কত কিছুই তো ঘটতে পারে৷ যেমন চোখের সামনেই পিয়াসা আর রাজের আধো বাংলায় পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠা৷
আজ যারা অচেনা৷ এবার এক পলকের একটু দেখা৷ সময়ের সিঁড়ি বেয়ে এরাই আবার হাজির হবে আগামী উত্তর আমেরিকা বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে৷ এবার কারও আলগোছে দৃষ্টি বিনিময়ই হয়ত আগমীবার সানফ্রান্সিকোতে হয়ে উঠবে শুভদৃষ্টি৷